Monday, August 26, 2024

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের কাছে একজন প্রত্যাখ্যাত অতিথির প্রশ্ন

গতকাল রাতে আমি জাতির উদ্দেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের বার্তা শুনেছি। আরো অনেকের মতো বার্তাটি আমার ভালো লেগেছে এবং সময়োপযোগী মনে হয়েছে। ড. ইউনূস কোনোরকম নাটকীয়তা এবং বাহুল্য ছাড়া ঝরঝরে ভাষায় একটি নতুন বাংলাদেশের কথা বলেছেন যেখানে আমরা সহযোদ্ধা, এক পরিবার, সবাই সমান, যেখানে কোনো ভেদাভেদ আমাদের স্বপ্নকে ব্যাহত করতে পারবে না। এই কথাগুলো শুনে আমি পাঁচ দিন আগে খসরা করে রাখা আমার লেখাটি প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি যা বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য যৎসামান্য ত্রাণ সমন্বয়ের ব্যস্ততার কারণে স্থগিত রেখেছিলাম। লেখাটি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং আবেগ থেকে উৎসারিত হলেও বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের জন্য এখান থেকে উঠে আসা প্রশ্নগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক মনে করি আমি। এমনকিছু আমি বলার প্রয়োজন বোধ করছি যা ড. ইউনূস তার বার্তায় বলেননি, এবং খুব সম্ভবত জানেনও না। ড. ইউনূসের পাশাপাশি আমি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চারজন নারী উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, যারা ২০ অগাস্ট ২০২৪ (মঙ্গলবার) ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বিভিন্ন নারী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। এই বৈঠককে কেন্দ্র করে পাওয়া অস্বচ্ছ এবং অসৌজন্য আচরণের জবাব খুঁজছি আমি। আমার লেখার ভাষায় ক্রোধ প্রকাশ পেতে পারে। কিন্তু আপনাদেরকে অসম্মান করা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি মনে করি জবাব পাওয়া আমার অধিকার। গত রাতে ড. ইউনূসের বক্তব্য শুনে আমার আস্থা জন্মেছে যে এই জবাব এখন চাওয়া যেতে পারে।


২০ অগাস্টের ওই বৈঠকে আমার থাকবার কথা ছিলো। অন্তত আমি তা-ই জানতাম। আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে অতিথিদের তালিকায় নাকি আমার নাম ছিলো না। তথ্য এবং যোগাযোগের অনুপস্থিতিতে আমি সেখানে হয়রানির শিকার হয়েছি। এই হয়রানির জের ধরে অনুভূত অসম্মানের রেশ বহুদিন থাকবে বলে ধারণা করছি। আমার অভিজ্ঞতার যথাযথ ব্যাখ্যা এবং মীমাংসা আমার প্রয়োজন।


খবরে জেনেছি বৈঠক শুরু হয়েছিল পৌনে বারোটায়। আমাকে আগেরদিন বলা হয়েছিল ২০ তারিখ সকাল ১১টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় উপস্থিত হতে। হয়েছিলাম। দায়িত্বরত কর্মকর্তারা যখন অতিথিদের তালিকায় আমার নাম খুঁজে পাচ্ছিলেন না, তাদেরকে আমার ভিজিটিং কার্ড দিয়ে অনুরোধ করেছিলাম ভেতরে কথা বলতে। সেই কার্ড ভেতরে পৌঁছেছিল কি না আমি জানি না। সকাল ১১টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করেছি। প্রথম এক ঘণ্টা তাদের সমন্বয়হীনতার সুরাহার আশায়। পরের দুই ঘণ্টা ক্রোধে। ডেকে নিয়ে করা এই অসম্মান মেনে নিয়ে ফিরে আসার কোনো কারণ আমার ছিলো না। একজন মানুষ তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করছে দেখেও কারো ভ্রূক্ষেপ দেখিনি। দেশ পুনর্গঠনে যেখানে জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস, যেখানে পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস ও সহযোগিতার কথা আমরা বারবার বলছি, সেখানে কারিগরি বিভ্রাট কিংবা প্রটোকলের দোহাই দিয়ে মানুষ আলোচনার টেবিল থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে, এটা আমি মানতে নারাজ।


আমি কে?

আমার নাম তৃষিয়া নাশতারান। আমি একজন নারীবাদী সংগঠক ও ফোরসাইট স্ট্র‍্যাটেজিস্ট। আমি প্রযুক্তি এবং মানবাধিকারকে একত্রিত করার কৌশল ডিজাইন করি,  ভবিষ্যতকে ডিকলোনাইজ করার জন্য গবেষণা ও কাজের সমন্বয় করি। লিঙ্গবৈষম্য, ডিজিটাল অধিকার এবং ইনক্লুসিভ ভবিষ্যত আমার প্রধান মাথাব্যথা। বাংলাদেশে আমার পড়ালেখা বুয়েটের তড়িৎ প্রকৌশলবিদ্যায়। স্নাতকোত্তর পড়ালেখা করেছি কানাডার অকাড ইউনিভার্সিটিতে স্ট্র্যাটেজিক ফোরসাইট অ্যান্ড ইনোভেশনে। সেখানে আমার গবেষণার বিষয়বস্তু ছিলো বাংলাদেশের ডিজিটাল স্পেসে নারীবাদের ভবিষ্যত। গত ১৩ বছর ধরে আমি মেয়ে নেটওয়ার্ক নামে একটি নারীবাদী গ্রাসরুটস অরগানাইজিং প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করছি যা নারীদের গ্রাসরুটস সংগঠনা, দেশি উদ্যোগের প্রসার এবং সর্বস্তরের মানুষের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে আসছে। বর্তমানে আমি ফেমিনিস্ট অ্যালায়েন্স অফ বাংলাদেশ (FAB) নামে একটি উন্মুক্ত বিউনিবেশবাদী, প্রগতিশীল নারীবাদী প্লাটফর্মের সমন্বয়ক ও সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি। কোনো ধরনের দাতা সংস্থা কিংবা রাজনৈতিক দলের সাথে আমার সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের কোনো সংযোগ নেই। এ কারণে বেশিরভাগ জায়গায় আমি বিচ্ছিন্ন থাকি।


আমি কীভাবে উপদেষ্টাদের বৈঠকে আমন্ত্রিত হলাম?

গত ১৫-ই অগাস্ট (বৃহস্পতিবার) ঋতু সাত্তার আমাকে কল দেন। ঋতু সাত্তার একজন শিল্পী। উনার একটি পারফরমেন্সের সূত্রে আমাদের পরিচয়। ঋতু জানান যে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে নারী সংগঠকদের একটি সৌজন্য সাক্ষাত হবে। সেখানে তিনি আমার নাম মনোনয়ন করতে চান, জানতে চান আমি আগ্রহী কি না। আমি জানাই যে আমি আগ্রহী এবং আমার বেশ কিছু প্রস্তাবনার কথাও জানাই। আমি আমার নাম, পরিচয়, ফোন নাম্বার, ইমেইল আইডি ঋতু সাত্তারকে দিই। ধারণা করেছিলাম ঋতু সাত্তার কোনোভাবে উপদেষ্টাদের সঙ্গে কাজ করছেন, এবং সেই সূত্রে অতিথি তালিকা তৈরি করার এখতিয়ার উনার আছে। ব্যাপারটা যে আসলে তেমনকিছু নয় সেটা আমি বুঝতে পারি ১৯ তারিখ রাতে যখন ঋতু সাত্তার বলতে পারছিলেন না এই বৈঠকে আর কারা থাকবেন এবং আলোচনার বিষয়বস্তু কী হবে। উনার ভাষ্যমতে উনি ক্ষুব্ধ নারীসমাজ নামের জোটের মাধ্যমে ফরিদা আখতারের সঙ্গে যুক্ত। যেহেতু ঋতু সাত্তার আমার খোঁজ উনাকে দিয়েছেন, সেই সূত্রে ঋতু সাত্তারকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এর বেশিকিছু উনি জানেন না। তবে সম্ভাব্য আলোচ্য বিষয় নিয়ে আমরা আলাপ করি। 


ফরিদা আখতার বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিমণ্ডলে পরিচিত মুখ। তবে উনাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। ক্ষুব্ধ নারীসমাজ সম্পর্কেও খুব একটা ধারণা আমার নেই। শুধু একবার তাদের একটি সমাবেশে গেছিলাম ফেসবুক পোস্ট দেখে। ফরিদা আখতার সেখানে ছিলেন কি না জানি না। এটা যে উনার উদ্যোগ আমি সেটাও জানতাম না। উনার কিংবা বৈঠকের আয়োজকদের আর কারো সাথে যোগাযোগের কোনো উপায় জানা না থাকায় আমি ঋতু সাত্তারের কথামতো বৈঠকের প্রস্তুতি নিই। বৈঠকের দিন, অর্থাৎ ২০ অগাস্ট সকাল সোয়া ১০টায় ঋতু সাত্তার আমাকে কল দেন আমি বাসা থেকে যমুনার উদ্দেশে রওনা দিয়েছি কি না নিশ্চিত হতে। আমি তখন পথে। এ পর্যন্ত আমি ঘুণাক্ষরে জানতাম না কীভাবে অতিথি তালিকা তৈরি হচ্ছে, কে তৈরি করছেন এবং কারা এই তালিকায় আছেন।


আমি যমুনার প্রধান ফটকে গিয়ে পৌঁছাই ১১টা বাজার চার মিনিট আগে। আমার নাম জানতে চাওয়া হয়। নাম শুনে উপস্থিত কর্মকর্তা বলেন যে আমার নাম ওই তালিকায় নেই। আমি তালিকা দেখতে চাই। কারণ আমার নামের বানান ভুল হওয়া নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। তালিকায় দেখি আমার পরিচিত এবং প্রিয় অনেক নারী সংগঠক সেই তালিকায় রয়েছেন, আবার আমার থেকেও যোগ্য অনেকে সেখানে নেই।


আমি এবার ঋতু সাত্তারকে কল দিতে শুরু করি। তিনি ফোন ধরেন না। তালিকায় আমার পরিচিত যারা ছিলেন তাদের কল দিই। তারা কেউই ফোন ধরেন না। ধারণা করি হয় তাদের ফোন সাইলেন্ট কিংবা তাদের ফোন রেখে দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বরত কর্মকর্তাদেরকে আমার ভিজিটিং কার্ড দিই। বলি ভেতরে কথা বলতে। কারণ ভাবছিলাম কোথাও কোনো ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। উনারা সবিনয়ে আমাকে গাড়িতে বসতে বলেন। ভেতর থেকে খোঁজ এলে তারা আমাকে জানাবেন বলে আশ্বস্ত করেন। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো খোঁজ আসে না। 


বলাবাহুল্য আমার অপেক্ষা মোটেও সুখকর ছিলো না। আমি একজন আমন্ত্রিত অতিথি। যেচে পড়ে যাইনি যে তাদের দুয়ারে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতে হবে আমাকে। সেদিন সকাল ১০টা থেকে আমার সংগঠনের দেয়ালচিত্রের কাজ শুরু হয়েছে ঢাকার অন্য এক এলাকায়। আমি সেই কাজ ফেলে নিজেকে এবং নিজের ভাবনাগুলো গুছিয়ে এনে হাজির হয়েছিলাম সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য। সেখানে আমাকে দরজা থেকে ফিরিয়ে দেওয়া, বসিয়ে রাখা এবং কোনো জবাবদিহিতার ধার না ধারা কোন ধরনের সৌজন্যমূলক আচরণ? আমরা তো রাজতন্ত্রের প্রজা নই যে সিংহদুয়ার থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে নীরবে করজোড়ে ফিরে আসব। আমি জবাবের অপেক্ষাতেই দাঁড়িয়ে ছিলাম ওখানে।



ছবি: মেয়ে নেটওয়ার্কের দেয়ালচিত্র, সৌজন্যে: সাজান রানা

বৈঠকশেষে বেলা দুইটার দিকে ঋতু সাত্তার বের হন যমুনা থেকে। তার কিছুক্ষণ পরে বের হন বীথি ঘোষ, শ্যামলী শীল এবং তাসলিমা আখতার। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করেন কেন আমি বৈঠকে ছিলাম না। অর্থাৎ ঋতু সাত্তার ছাড়াও আরো মানুষ জানতেন যে ওখানে আমার থাকার কথা ছিলো। উনাদের থেকে জানতে পারি যিনি অতিথিদের তালিকা তৈরি করেছেন তার নাম সীমা দাস সীমু। আমি উনাকে চিনি না। উনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে কোন পদাধিকারে যুক্ত সেটাও আমি জানি না। ঋতু সাত্তার সীমা দাসকে কল দিয়ে জানতে চাইলেন কেন আমার নাম ছিলো না তালিকায়। সীমা দাস নাকি বলেছেন তালিকা কোনোভাবে এলোমেলো হয়ে গেছে। উনার দেওয়া তালিকা আর উপদেষ্টার পাঠানো তালিকা কোনো একভাবে ভিন্ন হয়ে গেছে। তিনি নাকি আরো বলেছেন পরদিন, অর্থাৎ বুধবার সকালে ফরিদা আখতারের সাথে কথা বলে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হবে। প্রয়োজনে ফরিদা আখতারের সাথে ্নাকি আমাকে কথা বলিয়ে দেওয়া হবে। 


বুধবারে সকাল গড়িয়ে দুপুরে হলো। বেলা তিনটার দিকে সীমা দাস সীমু আমাকে কল দিলেন। তিনি মঙ্গলবার দুপুরে ঋতু সাত্তারকে যা বলেছিলেন সেগুলোই আমাকে বললেন এবং দুঃখপ্রকাশ করলেন। তিনি এ-ও বললেন যে তিনি জানেন না কীভাবে তালিকা এলোমেলো হয়ে গেছে। ফরিদা আখতারের সঙ্গে আলাপের ব্যাপারে উনি কিছু বললেন না। 


ফরিদা আখতারের সঙ্গে এখনো আমার আলাপ হয়নি। কেন উনার সঙ্গেই কথা বলতে হবে সেটাও আমি জানি না। তবে অতিথি তালিকায় ফরিদা আখতারের ভূমিকা আছে ধারণা করে ঘটনার দিনই বিকেল তিনটার দিকে ফরিদা আখতারকে ফেসবুকে একটি মেসেজ পাঠিয়েছিলাম আমি। কারণ উনার সাথে সরাসরি যোগাযোগের আর কোনো উপায় আমার জানা ছিলো না। আমার মেসেজ উনি দেখেননি এখনো। 


ঋতু সাত্তার বলেছেন ক্ষুব্ধ নারীসমাজের পরবর্তী ইভেন্টে আমি যেন যাই। ওখানে ফরিদা আখতারের সাথে কথা বলিয়ে দেবেন ঋতু সাত্তার। একজন উপদেষ্টার সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য কেন আমাকে তার সংগঠনের ইভেন্টে যেতে হবে, কেন ঋতু সাত্তার আমাদের পরিচয় করিয়ে দেবেন সেটা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। আলোচনার টেবিলে জায়গা পেতে কারো সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় তৈরিতে আমি আগ্রহী নই।


এখন আমি জানতে চাই -


১। অতিথিদের তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ এবং অগোছালো কেন? কে বা কারা তালিকা তৈরি করছেন? সেই তালিকা কাটছাঁট করছেন কে বা কারা?


২। অতিথিদের আমন্ত্রণ জানানোর দায়িত্ব কার এবং এর দাপ্তরিক পদ্ধতি কী? ঋতু সাত্তার কেন আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন? অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে উনার সম্পর্ক কী? 


৩। একটি রাষ্ট্রীয় আলোচনা অনুষ্ঠানের অতিথি তালিকা কি ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে হতে পারে? কেন অতিথিরা কোনো দাপ্তরিক চিঠি বা ইমেইলের মাধ্যমে আমন্ত্রণ পেলেন না? (অন্যরাও চিঠি পাননি। সবাই কারো না কারো ফোনকলে গেছিলেন।)


৪। আমার নাম কেন বাদ পড়ল তালিকা থেকে? এটা কি ইচ্ছাকৃত? এখানে কি ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন কেউ? এখানে স্বচ্ছতা কীভাবে নিশ্চিত করছেন আপনারা?


৫। যদি মনে হয়ে থাকে ওই বৈঠকের জন্য ঠিক মানুষ নই, সেটা আমাকে আগে থেকে কেন জানানো হয়নি এবং কেন দুঃখপ্রকাশ করা হয়নি? কেন ডেকে নিয়ে আমার সময় নষ্ট করা হলো? 


৬। আপনারা কীসের ভিত্তিতে প্রতিনিধি নির্বাচন করছেন? কীভাবে আপনারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কারা বাংলাদেশের নারীদের প্রতিনিধিত্ব করবেন? 


৭। অতিথি নির্বাচনে এত গোপনীয়তা কেন? কেন আপনারা উন্মুক্ত ডাক দেননি নারী সংগঠকদের? 


৮। ড. ইউনূসের বার্তা থেকে জেনেছি উপদেষ্টার পদমর্যাদাসম্পন্ন একজন বিশেষ সহযোগীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যার দায়িত্ব হবে জাতীয় সংহতি উন্নয়ন। তিনি কে?



ধরে নিই আমি নিতান্তই অজ্ঞ এবং অপাঙক্তেয় কেউ। তাও আমার সাথে যা ঘটেছে তা কারো সাথে করার অধিকার একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কারো নেই। বিশেষ করে যখন আপনারা একটি নতুন বাংলাদেশ, একটি সার্বজনীন ভবিষ্যতের কথা বলছেন, ক্ষমতাকাঠামোকে জনমুখী করার কথা বলছেন, তখন আলোচ্য বৈঠককে কেন্দ্র করে দৃশ্যমান অনিয়ম এবং অস্বচ্ছতা আপনাদের কর্মপদ্ধতি নিয়ে আমার মনে প্রশ্ন উদ্রেক করেছে। কারা প্রতিনিধি হবেন, কারা আলোচনায় থাকতে পারবেন সেই সিদ্ধান্ত কারা নিচ্ছেন? আপনাদের তৈরি করা তালিকা কি আড়ালে অন্য কেউ নিয়ন্ত্রণ করেন? অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে আপনাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কতটুকু?



ঘটনার পরদিন সীমা দাস সীমু ফোনে স্নেহের সুরে আমাকে বলেছিলেন, “আমরাও তো চাই ছোট মানুষরা আসুক, নতুনদের কণ্ঠ উঠে আসুক।”

আমি উনাকে সবিনয়ে বলেছি, “দিদি, আমি কখনো দেখিনি আপনাকে। আপনি সম্ভবত আমার থেকে বয়সে বড়। কিন্তু আমি ছোট মানুষ না। আমি প্রাপ্তবয়স্ক এবং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা আছে আমার। সেই জায়গা থেকেই আমি আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে চেয়েছি।”


আমি উনাকে যা বলেছি, আপনাদেরও তা-ই বলব – সমস্যাটা ব্যক্তিগত নয় এবং আপনাদের প্রতি আমার কোনো ব্যক্তিগত বিরাগ নেই। তাই ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোনোরকম আলাপ বা দুঃখপ্রকাশে এই সমস্যার সুরাহা হবার নয়।  আমি সীমা দাস সীমুকে বলেছি উনি যেন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যাখ্যা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এটা করার এখতিয়ার উনার আছে কি না, উনি এ ব্যাপারে আপনাদের সঙ্গে কথা বলেছেন কি না আমি জানি না। এখন পর্যন্ত কোনো উপদেষ্টার তরফ থেকে কোনোরকম অফিশিয়াল ব্যাখ্যা বা যোগাযোগ আমি পাইনি।


খবর পড়ে জেনেছি বৈষম্য নিরসনে নারী অধিকার কমিশন গঠনের দাবি উঠেছে বৈঠকে। আমি জানি না আপনারা কীভাবে কমিশন গঠন করবেন এবং সেই কমিশন কাদের নিয়ে কাজ করবে। সেই কমিশনে আমার মতোদের কতখানি প্রবেশাধিকার থাকবে তা জানতে উৎসুক আমি। বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিমণ্ডলে পা রাখার পর থেকে বহুবার বহু মুখে আমি শুনেছি পুরনোরা কতটা চান নতুনরা এগিয়ে আসুক। তারপর দেখেছি এই পুরনোদেরই কতজন পথ আগলে দাঁড়িয়ে থাকেন। সমস্যাটা উন্নয়নক্ষেত্রের নয়। সমস্যাটা বাংলাদেশের নেতৃত্বের সংস্কৃতির। ক্ষমতা কেউই ছাড়তে চান না। মাত্র একজন স্বৈরশাসকের পতন হলো। অন্ততপক্ষে অন্তর্বর্তীকালে একটি উন্মুক্ত জায়গা আমাদের প্রাপ্য ছিলো। এই উন্মুক্ত জায়গাটুকুর জন্য আমরা অনেকে অনেক বছর ধরে লড়ে যাচ্ছি। আরেকবার মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিলেন আপনারা। 


একটি নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারই যদি সমতা আর স্বচ্ছতা বজায় রাখতে না পারে, তাহলে আগামীর দলীয় রাজনীতির কী অবস্থা দাঁড়াবে, ভাবুন। বয়স, শ্রেণি, পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, সামাজিক পরিচিতি দিয়ে তৈরি করা হায়ারার্কি আর কত? আমি তাও যথেষ্ট সুবিধাপ্রাপ্ত একজন মানুষ। আমি ইন্টারনেট ব্যবহার করে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারি, কেউ জায়গা না দিলে নিজের জায়গা তৈরি করে নিতে পারি। যে মানুষটি আরো প্রান্তিক, যে মানুষের প্রবেশগম্যতা সীমিত, যে মানুষটির কণ্ঠ রুদ্ধ সে কীভাবে আপনাদের সাথে যুক্ত হবে? আপনি, আপনারা, আমি, আমরা সবাই তো একই পক্ষের মানুষ। এই পক্ষে সবার ক্ষমতা সমান তো? আমি একটি ডিকলোনাইজড, ইনক্লুসিভ ভবিষ্যত চাই। আমি চাই সবার জন্য স্বাধীন বিচরণ এবং মতপ্রকাশের সহজ, স্বচ্ছ পথ তৈরি হোক। আসুন, শুরুটা হোক একজন দলছুট, ক্ষমতাহীন মানুষের ক্রোধের জবাব দেওয়ার মধ্য দিয়ে। 


ড. ইউনূস সবাইকে ধৈর্য ধরতে বলেছেন। আমি ধৈর্য ধরে আপনাদের জবাবের অপেক্ষায় রইলাম।


তৃষিয়া নাশতারান

২৬ অগাস্ট ২০২৪

যোগাযোগ: nashtaran@gmail.com


Share:

Sunday, May 1, 2022

এই রাত তোমার আমার

আমার মনে হয় একটা শহরের সৌন্দর্য তার নাইট লাইফে। আমার চোখে ঢাকা সবচেয়ে সুন্দর রাত ১২টার পরে, ভোর ৬টার আগে। ইদানীং রমজান মাসে মানুষ গভীর রাতে সেহরি করতে দলবেঁধে রেস্টুরেন্টে যায়- আমার ভালো লাগে সেটা। অনেকদিন ধরে ইচ্ছা ছিলো সেহরিতে বের হওয়ার। বছর ঘুরে সেহরি 'সুহুর' হয়ে গেল। তাও আমার যাওয়া হচ্ছিল না। অনেককে বলেছি সঙ্গে যেতে, আমার সঙ্গে 'রাতের রানী' হতে। কারো হয়ত আগ্রহ হয়নি, কারো হয়ত সুযোগ হয়নি কিংবা সময় মেলেনি। বিশেষ করে যেহেতু 'ভালো মেয়ে'রা রাতে ঘরের বাইরে বের হয় না, সেহেতু রাত বারোটার পর বের হওয়া অনেকের জন্য কঠিন। আমার সেই দীর্ঘ অপেক্ষা ফুরালো পরশু রাতে। বন্ধুদের একটা উদযাপন ছিলো। আমি রাতে থেকে গেলাম আড্ডা দিতে।


ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেছিল। পুকুরপাড়ে বসেছিলাম কজন।


হু হু বাতাসে উড়ে যেতে যেতে মনে হলো এমন সুন্দর রাতে নগরভ্রমণ করা উচিত। ছেলেদের হল। গেট সারারাতই খোলা থাকে। স্মিতাকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। স্মিতার সেদিন জন্মদিন। তাই ওর ইচ্ছাতেই ঘোরা হলো। প্রথমে গেলাম বুয়েটে। বুয়েটের গেট বন্ধ। তারপর গেলাম পলাশীতে চা খেতে। পলাশীও বন্ধ। তারপর গেলাম বুয়েটের ছাত্রীহলে। এই হল আমাদেরকে রাত দশটার পরে ঢুকতে দিত না। রাত দুইটায় এসে দর্শন দিয়ে যাওয়াটা তাই জরুরি মনে হলো।


সেখান থেকে নীলক্ষেত। দোকানপাট সব খোলা। এমনকি বালিশ তোশকের দোকানও। এত রাতে কে বালিশ কিনতে আসে কে জানে? নীলক্ষেতের মোড়ে ট্রাফিক দেখে কে বলবে তখন রাত দুইটা?

জ্যাম এড়িয়ে টিএসসিতে চলে এলাম৷ বাইক পার্ক করে চা খুঁজতে লাগলাম। এক চাওয়ালা মামা নিজে এগিয়ে এলেন। স্মিতার সাথে ওয়ালেট নেই। আর আমার ওয়ালেটে টাকা নেই। ওয়ালেট খুলে দেখি দশ টাকার কটা নোট। এক কাপ র চা দশ টাকা। দু কাপ নিলাম। সাত কি আট বছর বয়েসি একটা মেয়ে অনেকগুলো বেলি ফুলের মালা নিয়ে এগিয়ে এলো। জিজ্ঞেস করলাম দাম কত। বললো বিশ টাকা। জিজ্ঞেস করলাম দশ টাকায় দেবে কি না। কারণ টাকা নেই সাথে। সে তার সমবয়েসি এক ছেলের সাথে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নিলো এত কমে মালা বেচবে না।

আমরা ফুটপাথে উঠে চা খেতে লাগলাম। মালা হাতে মেয়েটা ঘুরে বেড়াচ্ছে তখনো। আমাদেরকে সাবধানে এড়িয়েও যাচ্ছে। স্মিতা বললো মালাগুলো একদম তরতাজা, টাকা থাকলে কিনত।

জন্মদিনে একটা মানুষের এইটুকু শখ পূরণ হবে না এটা তো হতে পারে না। তাই একটা মালা নিয়েই নিলাম। ততক্ষণে ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমরা একটা কাঠবাদাম গাছের নিচে ঠাঁই নিলাম। সেখানে আরো কিছু ছেলে জটলা পাকিয়ে বসা। সামনে অনেকগুলো হেলমেট জড়ো করা। বুঝলাম তারাও বাইকার। তারা আমাদেরকে বসার জায়গা করে দিলো। বললো যে এই বৃষ্টি বেশিক্ষণ থাকবে না। টিএসসি মোটামুটি সরব তখনো। নারী পুরুষ সবাই আছে। ঘুরছে, আড্ডা দিচ্ছে, চা খাচ্ছে। একটা আনন্দময় পরিবেশ।

মিনিট পাঁচেক পরে বৃষ্টি ধরে এলো। আমরা ঘুরেফিরে আবার ক্যাম্পাসে চলে এলাম।



ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সুমাইয়া আপু বললো, "এখনই যাবা? পাখির ডাক শুনে যাও!" বললাম যে মানিকমিয়া এভিনিউতে নতুন সূর্য দেখতে চাই। বের হতে হতে পাখিরাও ডাকাডাকি শুরু করে দিয়েছে অবশ্য।



মানিকমিয়া এভিনিউতে এসে ঠিক ঠিক সূর্যোদয় পেয়ে গেলাম।


সঙ্গে পেলাম একরাশ সোনালু ফুল। 



একাগ্রচিত্তে দাঁড়িয়ে ফুল দেখছিলাম। এমন সময় গেরুয়া বসনে এক বুড়ো লোক আমার পাশে দাঁড়ালেন। বললেন কিছু টাকা দিতে। আমি জানি আমার ওয়ালেট তখন গড়ের মাঠ। তাই ক্ষমা চেয়ে নিলাম। উনি চলে গেলেন। কী মনে করে ওয়ালেট খুললাম আবার। দেখি পনেরো টাকা আছে। বুড়োকে ডাক দিলাম পেছন থেকে। যা ছিলো তা-ই দিলাম। উনি হেসে বললেন, "তোমার ভালো হোক।"
উনার ফিরে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে আছি, এমন সময় হাওয়ার দোলায় মাথার উপর থেকে সোনালু ঝরে পড়তে লাগল। 

জীবনের সৌন্দর্যে অভিভূত হৃদয় আর শূন্য পকেটে ঘরে ফিরেছি কাল। রাতটা ছিলো এক পরম উপহার।





Share:

Friday, October 16, 2020

বাংলাদেশের শাড়ি

আমি শাড়ি পরতে ভালোবাসি। এককালে ঝোঁকের বশে প্রচুর শাড়ি কিনেছি। মিনিমালিস্ট হওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ঝোঁক কমিয়েছি। তার মানে এই না যে আমি শাড়ি কিনবো না। মিনিমালিজম কনসেপ্টটা অনেকে ভুল বোঝেন। তারা মনে করেন মিনিমালিজম মানে কৃচ্ছতা। আমার কাছে মিনিমালিজম মানে পরিমিতি। কনজিউমারিজমের পাগলা ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে বুঝেশুনে পা ফেলা, অপচয় কমানো হচ্ছে মিনিমালিজম। ফাস্ট ফ্যাশনের এই যুগে আমি স্লো ফ্যাশনে যেতে আগ্রহী। তাই যা-ই কিনি ভেবেচিন্তে কিনি, আমার ও অন্যের জীবনে এবং প্রকৃতিতে তার প্রভাব কী তা ভাবি। সে হিসেবে একজন বাঙালির আলমারিতে বাংলাদেশের কোন কোন শাড়ি অন্তত একটা থাকলে ক্ষতি নেই এমন শাড়ির তালিকা বানাচ্ছি। কিছু বাদ পড়ে থাকলে মন্তব্যের ঘরে যোগ করে দেবেন দয়া করে।

  1. জামদানি
  2. মণিপুরি
  3. নকশি কাঁথা
  4. এন্ডি সিল্ক
  5. এন্ডি কটন
  6. কোটা
  7. কটকি
  8. তাঁতের সুতি
  9. খেস
  10. টাইডাই
  11. মোমবাটিক
  12. ভেজিটেবল ডাই
  13. যশোর স্টিচ
  14. ব্লক
  15. গামছা
  16. বিপ্লাস
  17. জুম
  18. হ্যান্ডপেইন্ট
  19. সিল্ক মসলিন
  20. প্রিন্টেড পিওর সিল্ক
  21. কাতান
Share:

Tuesday, December 31, 2019

Frequently Misused Words

গত তিন বছরে আমার শোনা কিছু শব্দ যেগুলোকে আমি নিয়মিত ভুলভাবে প্রয়োগ হতে দেখেছি সেগুলা লিখব। এই শব্দগুলোর নির্দিষ্ট অর্থ এবং তাৎপর্য আছে। আপনি যখন না বুঝে এই শব্দগুলো ব্যবহার করবেন তখন এই শব্দগুলোর সাথে জড়িত ব্যক্তি এবং কাজগুলোর প্রতি অন্যায় করা হয়। ইংরেজি বর্ণানুক্রমে লিখছি।
1. Autistic:
একজন ব্যক্তি অটিস্টিক মানে তার অটিজম নামের ডেভেলপমেন্ট ডিজর্ডার আছে। এই ডিজর্ডারের কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ আছে। অটিস্টিক শিশুরা সামাজিক যোগাযোগ স্থাপন করতে বেগ পায়, এরা প্রায়ই একই কাজ বারবার করতে পছন্দ করে, শব্দের প্রতি বিভিন্ন মাত্রায় অসহনশীলতা থাকতে পারে এদের। কিন্তু একজন অটিস্টিক ব্যক্তি কখনোই উন্মাদ কিংবা জড়বুদ্ধিসম্পন্ন নন। আপনি যখন বুদ্ধিহীন কিংবা বিচিত্র বুঝাতে কাউকে অটিস্টিক বলে সম্বোধন করেন, তখন আপনার সীমিত জ্ঞান যেমন প্রকাশ পায়, তেমনি অটিস্টিক ব্যক্তিদেরকেও অপমান করা হয়।
2. Depression:
ডিপ্রেশন মানে মন খারাপ না। ডিপ্রেশন একটা মানসিক ডিজর্ডার যেখানে একজন ব্যক্তি স্থায়ীভাবে বিষন্নতা ও শূন্যতাবোধের ভেতর দিয়ে যান। ডিপ্রেশনের মাত্রাভেদে একজন মানুষের দৈনন্দিন জীবন বিভিন্নভাবে অচল হয়ে যেতে পারে।
3. Feminist:
ফেমিনিস্টের বাংলা হচ্ছে নারীবাদী। অনেকে মনে করেন যেসব নারী বড় বড় কথা বলে তারা নারীবাদী, কিংবা যারা নারী অধিকার নিয়ে কথা বলেন তারা নারীবাদী। অনেকে এটাও ভাবেন যে নারীবাদ মানে পুরুষদের ঘৃণা করা। এর সব কটাই ভুল/অসম্পূর্ণ ধারণা। একজন ফেমিনিস্ট ব্যক্তি সকল জেন্ডারের সমতা চান। যেহেতু নারীর প্রতি বৈষম্য থেকে সমতার জন্য লড়াইটা শুরু হয়েছে, সেহেতু এর নাম হয়েছে নারীবাদ। কিন্তু নারীবাদী হতে পারেন নারী, পুরুষ কিংবা ভিন্ন জেন্ডারের যে কেউ। এখানে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা জেন্ডারের প্রতি কোনোরকম ঘৃণা জড়িত নেই। নারীবাদের শত্রু পুরুষ নয়। নারীবাদের শত্রু হচ্ছে পুরুষতন্ত্র। পুরুষতন্ত্র হচ্ছে একটা সিস্টেম যেখানে নির্ধারিত কিছু নিয়মের মাধ্যমে নারী ও পুরুষের মধ্যে বিভেদ বজায় রাখা হয়। একজন পুরুষও পুরুষতন্ত্রের ভিকটিম হতে পারেন এবং একজন নারীও পুরুষতান্ত্রিক হতে পারেন। পরেরবার যখন কাউকে নারী অধিকার নিয়ে কথা বলতে দেখবেন, আগে যাচাই করে নেবেন তিনি সব জেন্ডারের সমতা চান কি না। সমতা না চাইলে, ঘৃণার কথা বললে তিনি নারীবাদী নন।
4. Introvert:
ইন্ট্রোভার্টের বাংলা হচ্ছে অন্তর্মুখী। এটা কোনো মানসিক বা সামাজিক সমস্যা না। এইটা একটা পারসোনালিটি টাইপ। কিছু মানুষ হৈচৈ পছন্দ করে। কিছু মানুষ চুপচাপ থাকতে পছন্দ করে। যারা চুপচাপ থাকতে, একা থাকতে পছন্দ করে তাদের অনেকেই ইন্ট্রোভার্ট। এটা তাদের ব্যক্তিত্বের অংশ। যার ব্যক্তিত্ব যেমন তাতে সেভাবে গ্রহণ করুন।
5. Narcissist:
ফেসবুকে সেলফি দিয়ে ক্যাপশনে নার্সিসিস্ট লিখে নিজেকে খুব খুউল ভাবছেন? ভাইবেন না। নার্সিসিজম একটা পারসোনালিটি ডিজর্ডার। নার্সিসিস্ট ব্যক্তিরা প্রচণ্ড আত্মকেন্দ্রিক, ঈর্ষাপরায়ণ এবং দাম্ভিক হন। এরা অন্যের প্রতি কোনো সহানুভূতি ধারণ করেন না। আপনি যদি এমন না হয়ে থাকেন, তাহলে শুধু শুধু নিজের প্রতি ভালোবাসাকে নার্সিসিজমের নাম দিয়েন না। নিজের প্রতি ভালোবাসা থাকাটা ভালো ব্যাপার। নার্সিসিজম ভালো ব্যাপার না। আপনি যদি সত্যিই নার্সিসিস্ট হয়ে থাকেন, তাহলে নিজেকে বদলান। এটা গর্ব করার কিছু না।
6. OCD:
পুরো ফর্মটা হচ্ছে অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজর্ডার। বাংলায় বলে শুচিবাই। ভীষণ খুঁতখুঁতে হওয়া, বারবার একই কাজ করা ওসিডির কিছু লক্ষ্মণ। কিন্তু খাবার, পোশাক কিংবা অন্যকিছু নিয়ে নির্দিষ্ট পছন্দ/অপছন্দ থাকা মানে এই না যে আপনার ওসিডি আছে। ওসিডি একটা গুরুতর সমস্যা। কথায় কথায় ব্যবহার করে শব্দটাকে খেলো করে দেবেন না।
7. Schizophrenia:
কারো কথা বা কাজ আপনার সাথে মিলছে না বলে তাকে স্কিজোফ্রেনিক বলবেন না, প্লিজ। স্কিজোফ্রেনিয়া একটা ভয়ংকর বাজে মানসিক রোগ। এই রোগে একজন মানুষ অসংলগ্ন চিন্তা করেন, কথা বলেন এবং কাজ করেন। একজন স্কিজোফ্রেনিক ব্যক্তি পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে পারেন না, স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন না। আপনি যদি কোনো সত্যিকারের স্কিজোফ্রেনিক ব্যক্তিকে চিনে থাকেন তার প্রতি সহানুভূতিশীল হোন। কারণ মানুষটা নিঃসন্দেহে প্রচণ্ড কষ্টে থাকেন।
8. Secular:
ইদানীং দেখছি সেকুলারিজমকে নাস্তিকতার বিকল্প হিসেবে এবং সেকুলার শব্দটাকে গালি হিসেবে ব্যবহার করেন কেউ কেউ। সেকুলারিজম মানে ধর্মনিরপেক্ষতা। একজন সেকুলার ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেন না। একটা রাষ্ট্র যখন সেকুলার হয়, তার মানে সেই রাষ্ট্রে সকল ধর্ম সমান মর্যাদা পায়। একজন নাস্তিক ব্যক্তিও একটা সেকুলার রাষ্ট্রে নিরাপত্তা ও সম্মান পাওয়ার অধিকার রাখেন। কিন্তু সেকুলারিজম মানে নাস্তিকতা না। আপনি নিজের ধর্ম পালন করে যদি ভিন্ন বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের সাথে সহাবস্থান করতে পারেন, তার মানে আপনি সেকুলার ধারার মানুষ।

এমন অপপ্রয়োগের শিকার শব্দ আরো আছে নিশ্চয়ই। ইন্টারনেটের যুগে তথ্য অত্যন্ত সুলভ। কোনো নতুন শব্দ ব্যবহার করার আগে চট করে গুগল করে নিন। তাহলে আপনাকে আর বোকা বোকা কথা বলে বিব্রত হতে হবে না। :)

(এই পোস্টটা প্রথমে ফেসবুকে লিখেছিলাম আমি। সেটা আশাতীত সাড়া পাওয়ায় ব্লগে টুকে রাখলাম, যাতে প্রয়োজনে ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া সহজ হয়।)
Share:

বিজনেস ক্লাস

প্লেনের বিজনেস ক্লাস নিয়ে আমার আগ্রহ ছিলো অনেকদিন থেকেই। মধ্যবিত্ত বাঙালি যখন সরকারি সফরে বিজনেস ক্লাস পায়, তখন কায়দা করে টিকেটের ছবি তুলে ফেসবুকে দিতে দেখেছি (ছবির মতো)।

বন্ধুর মা-বাবা হজ্জে যাওয়ার সময় যে বিজনেস ক্লাসে গেছেন সেই গল্প কায়দা করে বলতে শুনেছি। বাংলাদেশের একজন সেলিব্রেটি রাঁধুনিকে বলতে শুনেছি তিনি যখন বিজনেস ক্লাস থেকে বের হচ্ছিলেন তখন ইকোনমি ক্লাসের এক যাত্রী তার ছবি তুলে কী ভীষণ 'উদ্ধত' আচরণ করেছিল। এসব দেখে আমার জানার ইচ্ছা ছিলো বিজনেস ক্লাসের বিশেষত্ব। এবার এমিরাতস এয়ারলাইনস রীতিমতো যেচে পড়ে আমাকে বিজনেস ক্লাসে তুলে দেওয়ায় সেই ইচ্ছাটা পূরণ হলো। আমার মতো যাদের এ ধরনের হাভাতে কৌতূহল আছে তারা বাকিটা পড়তে পারেন। এবার আমি সফরের প্রথম অংশ এমিরাতসের ইকোনমি ক্লাসে উড়েছি, দ্বিতীয় অংশে উড়েছি বিজনেস ক্লাসে। এই দুইয়ের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরব।



Space:
বিজনেস ক্লাসে বসার জায়গা বড়। সামনে পিছে, ডানে বামে সবদিকেই। সিট হেলিয়ে দিলে পেছনের যাত্রীর বুকের উপর চড়াও হতে হয় না। সুইচ টিপলে পা ছড়িয়ে দেওয়ার জায়গা তৈরি হয়ে যাবে। আরামে ঘুমানো যাবে। আমি সমস্যায় পড়েছি স্ক্রিন নিয়ে। জায়গা বেশি বলে টিভি স্ক্রিন বসার জায়গা থেকে বেশ খানিকটা দূরে। শুরুতে আমার রিমোট কাজ করছিল না। ফলে টাচস্ক্রিন ছুঁয়ে ছুঁয়ে চ্যানেল বদলানোর জন্য আমাকে সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে পিঠ বাঁকিয়ে স্ক্রিনের কাছে যেতে হচ্ছিল। ইকোনমি ক্লাসে স্ক্রিন ছোট হলেও একদম চোখের সামনে থাকে। সেই স্ক্রিনে আমি আরামে চারটা মুভি দেখে ফেলেছিলাম আগেরবার। বিজনেস ক্লাসে একটা দেখতে দেখতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
Privacy:
বিজনেস ক্লাসের প্রাইভেসি বেশি। দুই সিটের মাঝে হালকা দেয়াল থাকে। যদিও বিজনেস ক্লাসে আমার বাম পাশে বসা বাঙালি ভাইটি পুরো পথ দেয়াল ডিঙিয়ে আমাকে আড়চোখে দেখে গেছেন এবং আমার চ্যাগায় রাখা পায়ে লাথি দিয়ে দিয়ে টয়লেটে গেছেন। তবে তিনি ইকোনমি ক্লাসে সামনের সিটে বসা ভাইটির মতো সিটে হাত রাখতে গিয়ে বারবার আমার টিভি স্ক্রিনে হানা দিতে পারেন নাই।
Hospitality:
বিজনেস ক্লাসের ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্টরা অতিরিক্ত আন্তরিক। সিটে বসতে না বসতেই এসে জিজ্ঞেস করবে আমি কিছু খাবো কি না। ইকোনমি ক্লাসে যেখানে চেয়েও পানি পাওয়া যায় না, গলা শুকিয়ে খটখটে হয়ে গেলে উঠে গিয়ে পানি আনতে হয়, সেখানে বিজনেস ক্লাসে যেচে এসে পানি টানি দিয়ে যাওয়াটা একটু বেশিই ইয়ে লাগে। একবার ধাক্কা লেগে আমার জুসসমেত গ্লাস ফেলে দিলাম মেঝেতে। ফ্লাইট এটেন্ডেন্ট মিষ্টি হাসি দিয়ে এসে মুছেটুছে আরেক গ্লাস জুস রেখে গেল। আমি সরি টরি বলে অস্থির। সে মিষ্টি হেসে বললো, এটা কোনো ব্যাপার না। অথচ ইকোনমি ক্লাসে এক বাচ্চা আইলে বমি করে দিয়েছিল বলে ফ্লাইট এটেন্ডেন্ট সেটা পরিষ্কার করতে করতে শক্তমুখে বলছিল, "Stay where you are. I am trying to clean it." ফ্লাইট এটেন্ডেন্টের কষ্ট দেখে সহানুভূতি হয়েছিল আমার। বিজনেস ক্লাসের ফ্লাইট এটেন্ডেন্টদের আদরযত্ন দেখে উলটা মরমে মরে গেছি।
Food:
বিজনেস ক্লাসে খাবারের মান এবং অপশন বেশি। ইকোনমি ক্লাসে প্ল্যাকেটজাত জুস দেয়। বিজনেস ক্লাসে দেয় ফ্রেশ জুস। বিজনেস ক্লাসে শ্যাম্পেইন থাকে। আরো থাকে ওয়াইন আর ককটেইলের অনেক অপশন। ইকোনমি ক্লাসে বড়জোর ওয়াইন থাকে। তাও সবখানে না। অ্যাপেটাইজার, মেইন কোর্স, ডেজার্ট সবকিছুতেই বিজনেস ক্লাসে অপশন বেশি। খাবারের সাজসজ্জাও বেশি।
Lavatory:
টয়লেট দুই ক্লাসেই এক। আমি বিজনেস ক্লাসে আরেকটু বড় টয়লেট আশা করেছিলাম।
Others:
ইকোনমি ক্লাসে খাবারের সাথে প্যাকেটজাত ওয়েট ওয়াইপ দেয় একটা করে। বিজনেস ক্লাসে ওঠার পরপরই দেয় একটা ভাপ দেওয়া ওয়েট টাওয়েল। খাবারের সাথে আসে আলাদা ন্যাপকিন। বিজনেস ক্লাসে খাবার দেওয়ার আগে ফ্লাইট এটেন্ডেন্টরা নিজ দায়িত্বে এসে টেবিল পেতে দিয়ে তাতে চাদর বিছিয়ে দেবে। ইকোনমি ক্লাসে কোনো চাদরের বালাই নাই। খাবার এলে নিজ দায়িত্বে টেবিল খুলে নিতে হবে। বিজনেস ক্লাসের হেডফোনের মান ইকোনমি ক্লাসের থেকে ভালো। বিজনেস ক্লাসের কম্বল দুই পরতের। ইকোনমি ক্লাসে এক পরতের। মজার ব্যাপার হচ্ছে ইকোনমি ক্লাসে গুডি ব্যাগ দেয়, যার ভেতরে মোজা, আইপ্যাচ, টুথব্রাশ ইত্যাদি থাকে। বিজনেস ক্লাসে এই জিনিস দেয় নাই। আমি ভেবেছিলাম আরো ভালো মানের গুডি ব্যাগ হয়ত দেবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমি কি আবারো বিজনেস ক্লাসে ভ্রমণ করতে চাইবো?
প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে ডজন তিনেক ইকোনমি ক্লাস এবং একখানা বিজনেস ক্লাসের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, নিজের পয়সায় অদূর ভবিষ্যতে বিজনেস ক্লাসে ভ্রমণের সম্ভাবনা নাই। কয়েক ঘণ্টার জন্য তুলনামূলকভাবে একটু ভালো কম্বল, একটু ভালো খাবার, কয়েক ইঞ্চি বেশি জায়গা আর একটু বেশি আদরযত্নের জন্য এত টাকা খরচ করতে আমি এখনো প্রস্তুত না। বিশেষ করে টাকা দিয়ে আদরযত্ন কেনার ব্যাপারটা আমার মধ্যে অস্বস্তি জাগিয়েছে। এবার আমি ফ্রিতে বিজনেস ক্লাসে চড়ে বসেছি বটে। ফ্লাইট এটেন্ডেন্টরা তো সেটা জানত না। তারা তাদের কাজ করেছে। ইকোনমি ক্লাসে অভ্যস্ত আমি ক্লাস দিয়ে ভালো ব্যবহার পেয়ে শেখ সাদীর মতো অনুভব করেছি। এই অস্বস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছা আপাতত নাই।
Share:

Tuesday, July 9, 2019

পুকুরপাড়

পুকুরপাড়ের বাসাটা খুব মনে পড়ে। আর মনে পড়ে আমার ফেলে আসা অফিস। সবটাই তো খারাপ অভিজ্ঞতা ছিলো না। ভালো মানুষ ছিলো, ভালো টাকা ছিলো। স্বপ্নে ইদানীং অফিসে যাই। প্রিয় কলিগদের সাথে দেখা করি, বসে গল্প করি। ঘুম ভেঙে মন খারাপ হয়। পুকুরপাড়ের বাসাটা মনে পড়ে। ঝকঝকে রোদের দিনগুলো, বৃষ্টিভেজা দিনগুলো, ঘর অন্ধকার করে মুভি দেখা, প্রতিরাতে মিলেমিশে পিকনিকের মতো করে রাতের খাবার, যখনতখন আড্ডা আর হাত-পা ছড়িয়ে নিঃশ্বাস নেওয়া। আমি আমার স্বপ্ন আর স্বাধীনতা কিনেছিলাম চাকরির টাকা দিয়ে। এই যে সবকিছু ছেড়েছুড়ে বিদেশে পড়তে এলাম একটা স্বপ্ন নিয়ে, তার দাম দিয়েছি আমার নিজের জীবন দিয়ে, নিজের ছোট ছোট ভালোলাগা আর অনেক ভালোবাসা বিসর্জন দিয়ে। এখানে দুঃখ করারও সময় পাই না। টিকে থাকার হিসেব আর তুমুল ব্যস্ততার মধ্যে স্বপ্নগুলো বাঁচিয়ে রাখতে প্রতিদিন লড়তে হয়। একান্তই আমার একার লড়াই এটা। কতকিছু ছেড়েছি সে আমিই জানি শুধু।
Share:

Tuesday, April 2, 2019

বাড়ি ফেরা

লতা ছুটিতে বাড়ি গেলে ফিরতে চাইত না। নানান বাহানা করত। টাকাপয়সা ফুরিয়ে গেলে ফিরত অসুখবিসুখ নিয়ে হাড় জিরজিরে হয়ে। ঢাকায় থাকলে ও সুস্থ থাকত, ভালো খেতে পরতে পারত, স্কুলে যেতে পারত। এত 'আরামে' থেকেও কেন ও বাড়ি যেতে চাইত বুঝতাম না। এখন বুঝি। শুরুতে আমার হোমসিকনেস দেখে এখানে প্রফেসররা সহানুভূতি জানাত, পড়ার ছলে ক্লাসে গল্প করত মানুষের অভ্যস্ততা, সাংস্কৃতিক শেকড় নিয়ে। ক্লাসের কেউ কেউ ঝলমলে চাহনি দিয়ে বলত আমি কানাডায় থেকে গেলে কত ভালো হবে। ভালো মনেই বলত। কানাডা ছেড়ে কেন আমি বাংলাদেশে ফিরতে চাই এটা কেউ বুঝে না। বাঙালি অবাঙালি কেউই না। যেমনটা আমি বুঝতাম না লতা কেন ঢাকা ছেড়ে বাড়ি ফিরত।

Share:

Sunday, March 31, 2019

মরার সময় নাই

সকালে উঠে বাসায় কথা বলেছি। তারপর হাত-মুখ ধুয়ে সারাদিনের রুটিন বানিয়েছি, খাবার তৈরি করেছি, বাসা পরিষ্কার করেছি, এক্সারসাইজ করেছি, তারপর কাজে বসেছি। বেশি না। দশটা কাজ। পড়ার কাজ, অফিসের কাজ, ব্যক্তিগত কাজ। ইলেকটিভ কোর্সের ঝামেলা এখনো মেটে নাই। মেইল চালাচালি চলছে দশদিকে। অন্য সময় হলে প্যানিক করতাম। এখন প্যানিক করারও সময় নাই। নিজেকে বুঝিয়েশুনিয়ে কাজে বসিয়ে রাখা লাগছে। গত সাত মাসে অসংখ্যবার এমন হয়েছে যে আমার হঠাৎ মনে হয়েছে, আমি এখানে কেন? আমার কি এখানে থাকার কথা? স্ট্রেসে কতকিছু ভুলে যাচ্ছি, অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। তাও যে টিকে আছি এটাই সবথেকে বড় প্রাপ্তি।
Share:

Wednesday, July 4, 2018

মানুষের নোট

এই নোট কাগজের না। সুগন্ধীর নোট। আপাত 'অপ্রয়োজনীয়' জিনিস নিয়ে পড়ার, দেখার অভ্যাস আছে আমার। আজ পড়ছিলাম সুগন্ধী নিয়ে। প্রথমে উইকিপিডিয়া পড়লাম। পড়তে পড়তে অবাক হয়ে ভাবছিলাম সুগন্ধীর নোটের সাথে মানুষের কত মিল!


সুগন্ধীর বেলায় নোট দিয়ে সুগন্ধের ক্রম বুঝানো হয়। প্রতিটা নোটে একাধিক গন্ধের মিশ্রণ থাকে। কোন গন্ধের পরে কোনটা পাওয়া যাবে এটা নকশা করা হয় সুগন্ধী উপাদানগুলোর উদ্বায়িতার সময় অনুযায়ী।


টপ/হেড নোট হলো সুগন্ধীর চেহারা। বুঝতে পারা যায় একদম সঙ্গে সঙ্গে। অনেকটা মানুষের প্রথম দর্শনের মতো। প্রথম ঝলকে যেটুকু বোঝা যায় সেটুকু। ক্রেতা যেহেতু টপনোট শুঁকেই সুগন্ধী বাছাই করবেন, তাই বিক্রির জন্য টপনোট ঝরঝরে, সুন্দর হওয়ার দিকে জোর দেওয়া হয়।

মিডল/হার্ট নোট হলো সুগন্ধীর দেহ। চেহারার মোহ মিলিয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে দেখা দেয়। এই নোট সুগন্ধীর মৌলিক/বেজ নোটের প্রাথমিক কটু গন্ধকে আড়াল করে রাখে। সময়ের সাথে সাথে বেজ নোটের গন্ধে খোলতাই হতে থাকে। সে পর্যন্ত মিডল নোট সামলে নেয়। ঠিক যেন মানুষের চেতনার মতো। চেতনার গভীরে যে কটু সত্য, যে অকপট পরিচয় থাকে তাকে আড়াল করে রাখে শরীর। শরীরের সীমা পেরিয়ে ছুঁতে হয় সেই ভেতরের সত্ত্বাকে। এই সত্ত্বাটা মানুষের ভিত্তি। এটাই রয়ে যায়। সত্ত্বা, দেহ, চেহারা সবই পরস্পরকে প্রভাবিত করে। যেমনটা করে সুগন্ধীর একটা নোট অন্য নোটকে। কিন্তু রয়ে যায় বেজ নোটটাই।


Share:

Thursday, July 21, 2016

হীরের চাকা

কিছুদিন আগে যখন হীরের আংটির খোঁজখবর করছিলাম, তখন কারো কারো (কিংবা হয়ত অনেকের বা সবার) মনে প্রশ্ন জেগেছিলো আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি কি না। যারা আমাকে চেনেন তারা নিশ্চয়ই জানেন বিয়ে করতে আমার হীরের প্রয়োজন হবে না। আংটি আসলে খুঁজছিলাম আমার মায়ের জন্য। এর পেছনে একটা গল্প আছে। মুখে এই গল্পটা কখনোই বলে বোঝাতে পারব না। তাই অক্ষরের আশ্রয় নিচ্ছি। ব্লগ না লিখে আম্মুকে চিঠি লেখা যেত, মেইল করা যেত। কিন্তু আমি চাই আরো অনেকে জানুক এই গল্পটা। আমি নিশ্চিত এই গল্প আমার একার নয়, আরো অনেকের।

গল্পের শুরুটা কবে? দুই যুগ আগে যখন আমার ইচ্ছেপূরণের মূল্য আমার মা দিয়েছিলো তখন? নাকি চার দশক আগে, যখন আমার কিশোরী মায়ের ইচ্ছের মৃত্যু হয়েছিলো তখন?
আম্মু তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, লড়ছে। ছবিটা আব্বুর তোলা।
আমার মা মফস্বল শহরের ছাপোষা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছয় বোন আর দুই ভাইয়ের সংসারে বেড়ে ওঠা একজন বাঙালি মেয়ে। বাড়ির সংখ্যালঘু কালো সদস্যদের একজন ছিলো বলে তার জগতে গঞ্জনার অন্ত ছিলো না, আর ডানপিটে গেছো মেয়ে ছিলো বলে ভর্ৎসনাও কম সইতে হয়নি। নানাভাইয়ের (মানে আমার মায়ের বাবার) সাইকেল লুকিয়েচুরিয়ে হাফপ্যাডেলে চালাতে গিয়ে উলটে পড়ে গা ছড়ে দিয়ে বেদম মার খেত, লুকিয়ে গান শিখতে যেয়ে ধরা পড়ে গান শেখাও বন্ধ হয়ে গেল। মেয়ে বলে তার নিজের একটা সাইকেল কখনোই হয়নি। এমন আরো না হওয়া ব্যাপারগুলো নিয়ে তৈরি প্রথাগত ফর্দটা যেন তার কন্যাসন্তানকেও বইতে না হয় তার জন্য নিজ হাতে নিজের জীবনের কাঁটাতারগুলো একে একে উপড়ে গেছে সে। চোদ্দ বছর বয়সে বিয়ের ফাঁদ ডিঙিয়েছে, সবার ইচ্ছের বিরুদ্ধে ঢাকায় পড়তে এসেছে, নিজের বৃত্তির টাকায় পড়ালেখা শেষ করেছে, নিজের পছন্দে বিয়ে করেছে। হার না মানা কালো গেছো মেয়েটা আপন মনে লড়ে গেছে, গড়ে চলেছে তার অনাগত কন্যাসন্তানের জন্য জগতের আনন্দযজ্ঞের সরলতর পথ।

আমার যখন জন্ম, আমার মায়ের বয়স তখন ২৩। জন্মের পরপর বাবার কাজের সূত্রে ইরানের এক মনোরম গ্রামে থাকতে চলে যাই আমরা। হাসপাতালের সাথে লাগোয়া আমাদের ছোট্ট বাংলোকে ঘিরে কয়েক একরের বিশাল ফলফুলের বাগানে, যেখানে প্রায় বিকেলেই আড্ডা জমত, সেখানে এক আড্ডায় এক ইরানি বালকের বাইসাইকেলে আমার প্রথম হাতেখড়ি। তখন আমার বয়স সম্ভবত পাঁচ। বাইসাইকেল চালানো যখন শিখেই গেছি, এবার তো নিজের বাইসাইকেল চাই। প্রতি মাসে বেতন নিতে দল বেঁধে বড়রা ছোটদের বগলদাবা করে হৈ হৈ করে শহরে আসত। সেবার শহরে গিয়ে বাইসাইকেল দেখা শুরু হলো। 
ছবিটা ঢাকায় তোলা। আমার বয়স তখন ৮ কিংবা ৯। 
সঙ্গের সাইকেলটা সেই BMX-এর বড় সংস্করণ। 
দেশে ফেরার আগে প্রথমটা বদলে একইরকম দেখতে 
বড় সাইকেল নিয়ে এসেছিলো আম্মু, 
যাতে আরো অনেকদিন চালাতে পারি। 
অনেকদিন চালিয়েছিলামও।
অনেক অনেক বাইসাইকেলের ভিড়ে চোখ আটকে গেল একটা কালো-হলুদ BMX সাইকেলে। দাম মনে নেই। তবে দাম বাড়াবাড়ি রকমের বেশি ছিলো সেটা মনে আছে। সঙ্গে টাকা ছিলো না, নাকি খরচের খাতায় বাজেট ছিলো না সেটাও আমার মনে নেই। শুধু মনে আছে আমার মা কিছুতেই সেই সাইকেল ফেলে ঘরে ফিরতে রাজি ছিলো না। সে ঠিক করল তার হাতের আংটি বেচে এই সাইকেলটা সে আমাকে কিনে দেবে। এবার আমি বেঁকে বসলাম। জানি না কেন, মায়ের প্রিয় গয়না বিক্রি করে সাইকেল কেনার ভাবনায় প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছিলো। আম্মুই বুঝিয়ে শুনিয়ে রাজি করালো। আমাকে কাঁদতে দেখে আম্মু বললো বড় হয়ে অমন অনেক আংটি আমি আম্মুকে কিনে দিতে পারব, একটা আংটির জন্য নাকি এত দুঃখ পাবার কিছু নেই। তারপর পাশের এক দোকানে গিয়ে আংটি বিক্রি করা হলো। আংটিটার চেহারা স্পষ্ট মনে আছে আমার। সোনার আংটিতে উঁচু উঁচু নকশা করে ছোট ছোট হীরে বসানো। নকশাটা ভালো করে মনে রাখতে হয়েছিলো। কারণ, সেদিন সেই মুহূর্তে ছোট্ট আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম বড় হয়ে আম্মুকে অবশ্যই সেই আংটিটা কিনে দেবো।

কতটা বড় হলে তাকে ঠিক বড় হওয়া বলে জানি না। তবে যেই অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতার জন্য আমার মাকে লড়তে হয়েছে, সেই লড়াইয়ে অনেকখানিই জিতে গেছি। এই জয় অবশ্যই আমার মায়েরও। আমার সাথে সাথে আমার সাইকেলও বদলেছে, বড় হয়েছে। ইব্রাহিমাবাদের ধুলোমাখা পথ থেকে ঢাকার রাজপথে দীর্ঘ যাত্রায় বাংলাদেশের মেয়েদের সাইকেলের গল্প অনেকদূরই এগিয়েছে। শুধু বাকি ছিলো প্রতিজ্ঞা পূরণের। এই অনিশ্চিত সময়ে আর সবকিছুর আগে শৈশবের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করাটা আমার কাছে জরুরি মনে হলো।

গতবছর বিডিসাইক্লিস্টের বিজয় রাইডে কোনো এক অচেনা ফটোগ্রাফারের ক্যামেরায় তোলা ছবি

গয়নাগাটি যে আদৌ গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয় সে তো সেই পাঁচ বছর বয়সেই জেনেছি। বলাবাহুল্য, হীরের আংটি নিয়ে কোনোই ধারণা আমার ছিলো না। খোঁজ নিতে বসে আবিষ্কার করলাম, ঝকমকে এই পাথরের অর্থমূল্য প্রকারভেদে এক সপ্তাহের নেপাল ট্রিপ থেকে শুরু করে এক মাসের ইউরোপ ট্রিপের সমান হতে পারে। কদিনের সঞ্চয়ে কত মূল্যে অবশেষে এই আংটি কেনা হলো সেই গল্পে আর না যাই। অর্থমূল্য এখানে নেহাতই অপ্রাসঙ্গিক।

অনেক ধরেবেঁধে যেই আংটিটা আম্মুকে দিয়ে পছন্দ করাতে পারলাম সেটা দেখতে সেই আংটিটার মতো না। আমি তাকে নিয়ে গেছিলাম নিজের জন্য কিছুমিছু কিনব বলে। আমি যে আসলেই 'নিজের জন্য হীরের গয়না কিনতে চাই' সেটা বিশ্বাস করাতেও কিছুটা সময় নিয়ে সামান্য কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিলো। সে আদৌ জানত না সেই আংটিটার নকশা মাথায় গেঁথে বসে আছি, আর সেই আংটির স্মৃতির পথ ধরে এই আংটির পথ খোঁজার শুরু। পুরনো সেই আংটির জন্য হাহাকারও তার ছিলো না। তাই আংটি পছন্দ করার বেলায় পুরনো আংটির নকশা নিয়ে আদৌ ভাবিত ছিলো না সে। তার মেয়ে তাকে ভেবে কিছু দিয়েছে এতেই সে অতি অভিভূত। তার মেয়ে হীরে কেনার যোগ্যতা অর্জন করেছে তাতে হয়ত গর্বিতও। তার আদৌ মনে নেই আমার শৈশবের প্রতিজ্ঞার কথা, যেমনটা মনে নেই সেই আংটির শূন্যস্থান পূরণ করতে নতুন হীরের আংটি কেনার কথাও। 'এতগুলো টাকা' খরচ করে আংটি কেনায় তার ঘোর আপত্তি ছিলো। দোকানে দাঁড়িয়েই অনেকক্ষণ তার সাথে দেনদরবার করতে হয়েছে, ঠিক যেমন সাইকেলের দোকানে দাঁড়িয়ে আমাকে রাজি করতে বেগ পেতে হয়েছিলো তাকে।
হীরের দোকানে দাঁড়িয়ে আমি বলতে পারিনি এই আংটির জ্যোতি আম্মুর চেহারার ছেলেমানুষি খুশি আর গর্বভরা হাসির কাছে ম্লান, শৈশবের সেই প্রতিজ্ঞা পূরণ করতে পারা আমার কাছে অনেক বড় কিছু।


গীতি আপা একবার বলেছিলেন, "প্রতিটা মেয়েই তার মায়ের স্বপ্ন।"
আমার মায়ের অনেক স্বপ্নই আমি পূরণ করতে পারিনি। নিজের সব স্বপ্ন যে পূরণ করতে পেরেছি তাও নয়। আমি চাই প্রতিটা মেয়ে সব কাঁটাতার পেরিয়ে মানুষ হোক, আর প্রতিটা মানুষ নিজের ইচ্ছের সমান বড় হোক, স্বপ্নের মতো উজ্জ্বল হোক তার ভবিষ্যত। সাইকেলের চাকা ঘুরে হীরের আংটির এই যাত্রা আমাদের মা-মেয়ের ইচ্ছেপূরণের পথে ছোট্ট একটা মাইলফলকমাত্র।
Share: